নাসির উদ্দিন তারেক ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ , ৫:৫২ পিএম প্রিন্ট সংস্করণ
বগুড়ায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সুদখোররা। বিনা লোকশানে এই ব্যবসা করে রাতারাতি কোটিপতি বনে যেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে এসব অসাধু প্রকৃতির মানুষ। কোনরুপ নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই নিজের খেয়াল খুশি মতো উচ্চ মাত্রার লাভে সুদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে তারা।

শুধু তাই নয় সুদ গ্রহিতার কাছ থেকে ফাঁকা স্ট্যাম্প ও ব্যাংকের চেক এ স্বাক্ষর নিয়ে জিম্মি করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আসল ও কিছু সুদের টাকা পরিশোধ করলেও সুদের সুদ দিতে না পারলে ঐ দুই কাগজের বলে আইনের মার প্যাচে জেলে যেতে হচ্ছে অসহায় সুদ গ্রহিতাদের। ব্লাঙ্ক চেক দিয়ে জিম্মি হয়ে পরা সুদ গ্রহিতারা মামলার ভয়ে প্রশাসনের আশ্রয়ও নিতে পারেন না।
জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার পাড়ায় পাড়ায় চলছে সুদের এমন আগ্রাসন।গুজিয়া,কাশিপুর,লস্করপুর, ভায়েরপুকুর, মোকামতলা,ভরিয়া,মালাহার,মুরাদপুর, রহবল, গাংনগর, কিচকসহ বিভিন্ন এলাকায় দিন দিন সুদের ব্যবসা বেড়েই চলেছে। দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক হারে চলছে জমজমাট এ ব্যবসা। অনেকেই আবার ঘন্টা প্রতি লাভ নিয়ে টাকা দিচ্ছেন বিপদ গ্রস্থ এসব সুদ গ্রহিতাদের।
ইতোপূর্বে উপজেলার অনেকেই সুদ মেটাতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন। সুদের টাকাকে কেন্দ্র করে খুন, অপহরণের মতো ঘটনাও ঘটেছে একাধিক।
এ ব্যাপারে সুদের ভয়াল ছোবলে নি:শ্ব হওয়া উপজেলার লস্করপুর গ্রামের মিজান মিয়া জানান, আমি বিপদে পরে এক সুদখোরের কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে ছিলাম। তারা আমার ব্লাঙ্ক চেক জমা ও সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয়। সেই টাকার ৫ গুন লাভ দিয়েও ঋণের হাত থেকে রেহাই পাইনি। পরে সুদ শোধ করতে সমিতি থেকে কিস্তি তুলি। এভাবে দেনা বাড়তে বাড়তে বাড়ির যায়গা পর্যন্ত বিক্রি করে এখন আমি নি:শ্ব।
বিপদে পরে রোজগারের সব টাকা দিয়ে সুদের সুদ মেটাতে না পেরে সুদখোরদের হুমকী ধামকীতে বাড়ি ছাড়া মোকামতলা ইউনিয়নের চলনাকাথী গ্রামের সোহেল রানা। সুদের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে কয়েকবছর যাবৎ নিরুদ্দেশ সে।
একই ইউনিয়নের কাশিপুর গ্রামের শামছুল সুদখোরদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে স্ব পরিবারে বাড়ি ছাড়া।
উপজেলা সদরের গুজিয়া উত্তর শামপুর এলাকার কিটনাশক ব্যবসায়ী শিহাব উদ্দিন সুদখোরদের ফাঁদে পড়ে ব্যাংকে চেকের মামলা খেয়ে বাড়ি ছাড়া।
একই এলাকার দ্বীন মজুর আনিছার রহমান শুকটু চড়া লাভে সুদে টাকা নিয়ে পরিশোধ করতে না পেরে স্ত্রী পরিজন নিয়ে উধাও হয়েছেন।
উপজেলার কিচক ইউনিয়নের মাটিয়ান চল্লিশছত্র এলাকার রাইস মিলের মালিক মিলন মিয়া। জরুরি দরকারে এলাকার দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সুদে টাকা ধার নিয়ে পরিশোধ করতে না পেরে সুদারুদের চাপে অতিষ্ঠ হয়ে দেশান্তর হয়েছেন।
পল্লী চিকিৎসক শ্রী মাধব চন্দ্রের বাড়ি শিবগঞ্জ উপজেলার রহবল এলাকায়। মেয়ের বিয়ের সময় দেউলী এলাকার এক দাদন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মাসে ২৫ হাজার টাকা সুদ দেয়ার শর্তে দুই লাখ টাকা নেয়। এজন্য দাদন ব্যবসায়ীকে দু’টি ব্ল্যাঙ্ক চেক ও ফাঁকা স্ট্যাম্প- এ স্বাক্ষর দিতে হয়।
লোনের এ টাকা শোধ করতে গত ২৪ মাসে প্রায় চার লাখ টাকা পরিশোধ করার পরও, বাকি সুদ ও আসল মিলিয়ে আরও চার লাখ টাকা দাবি করে মাধবকে হুমকি ও মারধর করা হয়েছিল।
এ টাকা শোধ করতে গিয়ে দাদন ব্যবসায়ীদের (সুদারু) কাছে সুদে টাকা নিতে হয়েছে মাধবকে। চক্রবৃদ্ধিহারে সুদ দিতে দিতে ভিটে-মাটি বিক্রি করে পালিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছিলেন তিনি। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে রক্ষা পায় মাধব।
উপজেলার গাংনগর দাখিল মাদ্রাসার সুপার আ. ওয়াহাব জানান, আমার প্রতিষ্ঠানের দু’জন শিক্ষক-কর্মচারী মোকামতলা এলাকার এক দাদন ব্যবসায়ীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছিল। পুরো বইয়ের চেক স্বাক্ষর করে দাদন ব্যবসায়ীকে দিতে বাধ্য হয়েছিল তারা। গত চার বছর ধরে বেতন তুলতে পারছিল না তারা। পরে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির হস্তক্ষেপে তারা রক্ষা পায়।
এ ধরনের ভুক্তভোগীরা জানান, ঋণ নেওয়ার আগে দাদন ব্যবসায়ীর কাছে স্বাক্ষর করা চেক বা স্ট্যাম্প জমা রাখতে হয়। তারা চাকরি করলেও মাস শেষে ব্যাংক থেকে বেতনের টাকা তোলেন দাদন ব্যবসায়ীরা। ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে দাদন ব্যবসায়ীদের সুসম্পর্ক থাকায় তারা সহজে টাকা তুলে নিতে পারে।
এ প্রসঙ্গে কোন দাদন ব্যবসায়ী সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে রাজি হননি। বক্তব্য নিতে গেলে তারা বলেছেন,আমরা টাকা কি জোর করে দিয়েছি? তারা নেয় কেনো?
সুদখোরদের এমন ব্যপরোয়া হয়ে ওঠা নিয়ন্ত্রণ করতে প্রশাসনের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে শিবগঞ্জ সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে এ বিষয়ে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।#











